বিবাহ কি ভবিতব্য? | বেদবাণী ১৪৫ | শ্রীশ্রী রামঠাকুর ও গীতার আলোকে ভাগ্যের রহস্য,#ভবিতব্য,#বেদবাণী
স্বর্গীয় ড. ইন্দুভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তার ভ্রাতুষ্পুত্র স্বর্গীয় লোকনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়:-
স্বর্গীয় ডক্টর ইন্দুভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভ্রাতুষ্পুত্র সম্প্রতি পরলোকগত ডাক্তার লোকনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তখন থাকতেন ইন্দুভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১২সংখ্যক দেশপ্রিয় পার্ক রোডের বাড়িতে। লোকনাথ বাবুর চেম্বার ছিল লেক মার্কেটের উল্টা ফুটপাথের কিছুটা পশ্চিমে রাসবিহারী এভিনিউর উপর একটি বাড়ির একতলার একখানি ঘরে।
সেদিন বাজার থেকে আনা ফুলকপির আকৃতি ও উৎকর্ষ দেখে ডক্টর ইন্দুভূষণের সহধর্মিণীর প্রবল বাসনা হলো ভাপে-সিদ্ধ এই কপি রান্না করে ঠাকুরমহাশয়ের ভোগের জন্য পাঠিয়ে দেবার। ঠাকুরমহাশয় তখন ছিলেন তাদের বাড়ি থেকে অনতিদূরে সতীশ মুখার্জি রোডে এক বাড়িতে। মহা উৎসাহ ভরে তিনি নিজহস্তে ঠাকুরমহাশয়ের ভোগ রান্নার বাসনপত্র মেজে ধুয়ে নিলেন। রন্ধনকর্মে তিনি ছিলেন সুনিপুনা। অসীম আগ্রহে ঠাকুরমহাশয়ের জন্য ভাপান কপি রান্না সমাপ্ত করলেন। এখন সমস্যা, ঠাকুরমহাশয়ের এই ভোগ পাঠাবেন কাকে দিয়ে? ডক্টর ইন্দুভূষণ অনেকক্ষণ আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেছেন। ছেলেরাও চলে গিয়েছে তাদের স্কুল কলেজে। চাকরের হাত দিয়ে তো ঠাকুরমহাশয়ের ভোগ পাঠান যায় না। অথচ বেলা বারটার মধ্যে না হলে ঠাকুরমহাশয়ের ভোগ দুর্ভোগই হয়--একথাও তার অজানা নয়। সেজন্য অধীর আগ্রহে লোকনাথবাবুর প্রত্যাগমনের প্রতিক্ষায় তিনি বসেছিলেন। আর ভাবছিলেন লোকনাথবাবুর ফিরতে যদি বিলম্ব ঘটে তা হলে তো আর সেদিন ভাপান কপি ঠাকুরমহাশয়ের ভোগে লাগবে না।
ডক্টর ইন্দুভূষণের সহধর্মিণীর ভাগ্য আজ সুপ্রসন্ন। লোকনাথবাবু ফিরে এলেন প্রায় বেলা ১১-৩০টার সময়। এত আগে ফেরা তার পক্ষে কদাচিত ঘটে।
লোকনাথবাবু আসতেই তার কাকিমা সব ঘটনা তাকে বললেন। সতীশ মুখার্জি রোডে যে বাড়িতে ঠাকুরমহাশয় তখন ছিলেন, সেখানে নিয়ে যাবার জন্য বড় টিফিন কেরিয়ারটি লোকনাথবাবুর হাতে তুলে দিলেন।
লোকনাথবাবু স্নানের তাগিদ অনুভব করছিলেন। ক্ষুধাও তার প্রচন্ড ভাবেই পেয়েছিল। কিন্তু হাতে তো আর সময় নেই। স্নানাহার শেষ করে যেতে হলে বেলা ১২টা অতিক্রান্ত হয়ে যাবে। বরং ১২টার মধ্যে সেখানে ঠাকুরমহাশয়ের ভোগ্যবস্তু পৌঁছে দিয়ে এসে নিজের স্নানাহার সমাপন করবেন। তাতে দু'কুলই রক্ষা পাবে। কালবিলম্ব না করে অতি দ্রুতপায়ে চলে লোকনাথবাবু ঠাকুরমহাশয়ের কাছে উপস্থিত হলেন বেলা ১২টার পূর্বেই।
সে সময় ঠাকুরমহাশয়ের কাছে অনেক নর-নারী বসেছিলেন। লোকনাথবাবুর আনা ভোগ্যবস্তু ঠাকুরমহাশয় ঐ বাড়ির গৃহকর্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে বললেন, "এই ভোগ সকলকে সমভাবে বন্টন কইর্যা দ্যান"। একখণ্ড কপির অর্ধাংশ ঠাকুরমহাশয় নিজের মুখে দিলেন। উপস্থিত সকলেই ঐ পরিমাণের প্রসাদই পেলেন। লোকনাথ বাবুরও ভাগ্যে অনুরুপ প্রসাদ লাভ হলো। ঘরের একটি কোণে বসেছিলেন লোকনাথবাবু। আর সকলের সঙ্গে আনন্দ--পুলকিতচিত্তে তিনি শুনছিলেন ঠাকুরমহাশয়ের কথা। শীতের দিনে কখন যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে সে সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সচেতন ছিলেন না লোকনাথবাবু। ঠাকুরমহাশয় যখন লোকনাথবাবুকে বললেন যে সন্ধ্যা উত্তীর্ণ। লোকনাথবাবু, ডিসপেনসারি খুলবেন কখন? আর বিলম্ব করলে রোগীদের অসুবিধা হতে পারে। তখন হারান সম্বিত লোকনাথবাবু যেন ফিরে পেলেন ঠাকুরমহাশয়ের কথায়। তাড়াতাড়ি ঠাকুরমহাশয়কে প্রণাম করে তিনি পথ চলতে আরম্ভ করলেন।
সারাদিন যে তিনি অস্নাত ও অভুক্ত তার জন্য কোন অসুবিধাই তিনি বোধ করছেন না। তার নিয়মমত তিনি সকালবেলা বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন এক কাপ দুধ আর দুটি থিনএর্যারুট বিস্কুট খেয়ে। দুপুরে পেয়েছেন ঠাকুরমহাশয়ের প্রসাদ, একখন্ড কপির অর্দ্ধাংশ মাত্র। তবু সারাদিন প্রায় অনাহারে কাটলেও ক্ষুধা তাকে তিলমাত্র দহন করেনি। অস্নাত, অভুক্ত লোকনাথবাবুর সেদিনও অন্যদিনের মত দেহমন সজীব। তিনি গিয়ে ডিসপেন্সারী খুললেন। এ সময় তো আর বাড়ি যাওয়া যায় না।কারণ রোগীরা ফিরে যেতে পারে। আর খাওয়া, সেটা চেম্বার থেকে ফিরে রাত্রেই করা যাবে।
সেদিন ডক্টর ইন্দুভূষণে সহধর্মিণীর অত্যন্ত দুঃশ্চিন্তার মধ্যে দ্বিপ্রহরটি কেটেছিল। ভাবছিলেন লোকনাথবাবুকে স্নানাহারের সময়টুকু না দিয়ে বাড়িতে ফেরামাত্র আবার তাকে অন্যত্র পাঠানোয় তার নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হয়েছে এবং তিনি নিশ্চিত ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তার মায়ের মন, বারে বারে শুধু চিন্তা করছেন আহা ছেলেটা সারাটা দিন না পেল খেতে না পেল স্নান করতে।
লোকনাথ বাবু চেম্বার খোলার কিছু পরেই বাড়ি থেকে একটি লোক এসে দুপুরের বাড়ি না ফেরার কারণ জিজ্ঞাসা করল এবং তার জন্য তার কাকিমা যে বড়ই উদ্বেগে আছেন সে কথা জানাল। ঐ লোক মারফত লোকনাথবাবু তার কাকিমাকে বলে পাঠালেন যে স্নানাহার না করার জন্য আজ কোন অসুবিধা তার হয় নি। কাকিমা যখন উদ্বেগে আছেন তখন তাড়াতাড়ি চেম্বার বন্ধ করে তিনি বাড়ি যাবেন।
লোকনাথবাবুর চিন্তা ছিল অন্যরুপ। তিনি ভাবছিলেন যাঁর সান্নিধ্যে ও কথাশুনে ক্ষুৎপিপাসা সম্পূর্ণরূপে নাশ হয়, তাঁর কথা কিছুটা অনুসরণ করতে পারলে আর্তিও নিশ্চিত হ্রাস পায়।
জয় রাম জয় গোবিন্দ।
