শ্রীশ্রী রাম ঠাকুর, যাঁর সন্ন্যাস জীবনের পূর্বের নাম ছিল রামচন্দ্র চক্রবর্তী। পরাধীন ভারতে ১৮৬০ সালে বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলায় শ্রী রাধামাধব চক্রবর্তী ও শ্রীমতী কমলা দেবীর সন্তান হিসেবে শ্রীশ্রী রাম ঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন। রাম ঠাকুরের আরেক যমজ ভাই ছিল, তাঁর নাম ছিল লক্ষণ।
তাঁদের পারিবারিক গুরু ছিলেন শ্রী মৃত্যুঞ্জয়ন্যায় পঞ্চানন। বালক রামচন্দ্র শৈশব থেকেই আধ্যাত্মিক চেতনার অধিকারী ছিলেন। শাস্ত্রে তাঁর খুব আগ্রহ ছিল; মাঝে মধ্যেই ঈশ্বর চিন্তা করে তিনি ভাব তন্ময় হয়ে যেতেন। ঈশ্বরকে কেন্দ্র করে নানা আধ্যাত্মিক প্রশ্ন তাঁর মনে ঘুরপাক খেত। এই ঈশ্বরের খোঁজেই ১৮৭২ সালে সকলের অজ্ঞাতে অজানাকে জানার লক্ষ্যে তিনি গৃহ ত্যাগী হন
পরে পৌঁছালেন অসমের শ্রীশ্রী কামাক্ষ্যা দেবীর মন্দিরে এবং এক অক্ষয় তৃতীয়ার দিন শ্রীশ্রী রাম ঠাকুর দেখেন জটাধারী, দীর্ঘাঙ্গী এক জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ সামনে দাঁড়িয়ে। গুরু হিসেবে তিনি সেই দিব্য পুরুষকে গ্রহণ করলেন; শুরু হলো তাঁর সাধনা ও আধ্যাত্মিক যাত্রা। কঠিন সাধনায় একসময় তিনি হয়ে উঠলেন অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন রামঠাকুর, অষ্টসিদ্ধি লাভ করলেন তিনি। বহু অলৌকিক ঘটনা তিনি ঘটিয়েছেন তাঁর জীবন দশায়, যার মধ্যে দুটি ঘটনা আজ আপনাদের বলব।
একবার ঠাকুর কলকাতায় এক ডাক্তার ভক্তের বাড়িতে ছিলেন। একদিন সকালে তাঁর বৈঠকখানার ঘরে তিনি, ঠাকুর এবং সেই সময়ের বিখ্যাত কবিরাজ জানকীনাথ দাশগুপ্ত বসে আছেন। ঠাকুর তাঁদের ধর্মের শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা শোনাচ্ছিলেন। হঠাৎ দেখা গেল, ঠাকুরের হাতে ছোট ছোট গুটি বেরোতে শুরু করল। ক্রমে সেই গুটি তাঁর সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। কবিরাজ জানকীনাথ দেখামাত্র বুঝতে পারলেন যে ওগুলো গুটিবসন্ত। সবাই আতঙ্কিত। ঠাকুর হেসে বললেন, ‘ভয় পাওয়ার কিছু নেই, এর জন্য ওষুধের প্রয়োজন হবে না।’ এই কথা বলে ঠাকুর সেই গুটি গুলোকে এক এক করে টিপে টিপে বসিয়ে দিতে লাগলেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই সব গুটি ঠাকুরের গা থেকে ম্যাজিকের মতো মিলিয়ে গেল। ঠাকুর বললেন, ‘এ রোগ আমার নয়, অনেকদিন আগে আমার এক ভক্তের গুটিবসন্ত হয়েছিল। সেদিন তাঁকে পরিচর্যা করে যমের কাছ থেকে ফিরিয়ে এনেছিলাম। যম ছেড়ে দিলেও রোগ কি ছাড়ে? সেই ভক্তের রোগ আজ আমাকে ভোগালেও মারতে পারল না।’ একবার ভক্ত রোহিণী বাবুর বাড়িতে এসেছেন ঠাকুর। সৎসঙ্গ শেষ করে খাওয়ার সময় ঠাকুর বললেন যে তিনি মাংস খাবেন।
উপস্থিত সকলে চমকে উঠলেন। যে মানুষটা সারাদিনে একটা ফলও খায় না, সে আজ মাংস খেতে চাইছে! রোহিণী বাবু উল্লসিত, তাঁর বাড়িতে পরমপুরুষ শ্রী রাম ঠাকুর মাংস খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন—এ তাঁর পরম সৌভাগ্য। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ঠাকুরকে এক বাটি মাংস এনে দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে সেই মাংস খেয়ে নিয়ে ঠাকুর বললেন, ‘আরও মাংস নিয়ে এসো, তোমাদের কাছে যা আছে সব নিয়ে এসো।’ সেই রাতে বাড়ির সব রান্না করা মাংস খেয়ে শেষ করেছিলেন ঠাকুর।
সেই রাতে ঠাকুরের পেটে অসহ্য ব্যথা হয়। পরে জানা যায় যে, সেই মাংসে বিষ ছিল। বাড়ির লোক এবং পশুপাখিদের রক্ষা করতে তিনি বিষ নিজে খেয়েছেন। যদিও সেই বিষ শরীরে ধারণ করেও তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। আজকের পর্ব এখানেই শেষ করলাম। পরের পর্বে আবার অন্য কোনো গুরুর কথা নিয়ে ফিরে আসব। পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ
