গুরু তো সামান্য মানুষ নয়। একটি অসাধারণ #ভক্তি_মূলক_গান। চিত্র পট এ গুরুদেব #শ্রীশ্রীরামঠাকুর।
কৈবল্যধাম আশ্রমেই ঠাকুর তিন দিন তিন রাত্রি স্থূল দেহে বাস করেছিলেন:-
অবশেষে আশ্রমের জন্য এই স্থানটি শ্রীশ্রীঠাকুরের পছন্দ হইয়াছে জানিয়া সকলের কি আনন্দ। সবাই ঠাকুরকে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিলাম, পরে সবাই ঠাকুরের সঙ্গে চট্টগ্রাম শহরে বিধুদার বাড়ীতে ফিরিয়া আসিলাম । বিধুদার বাসায় উপস্থিত সকলেই আশ্রমের নির্ম্মাণকার্য্য শীঘ্রই আরম্ভ করিতে হইবে বলিয়া স্থির করেন। পূজনীয় বিধুদারই উৎসাহ ছিল সৰ্ব্বাধিক। পর দিন শ্রীশ্রীঠাকুরকে সঙ্গে লইয়া চাঁদপুরে ফিরিয়া আসি। আট-দশ দিন পরেই সংবাদ পাইলাম বিধুদা আশ্রমের নির্ম্মাণকার্য্য আরম্ভ করিয়াছেন ।ঠাকুর এই আশ্রমকে “কৈবল্যধাম” নামে অভিহিত করিলেন। ঠাকুরের আদেশে ১৩৩৭ সালের ১০ই শ্রাবণ, শুক্রবার এই আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়। কৈবল্যনাথের চিত্রপট প্রতিষ্ঠা করিয়া উৎসব করা হয়। সমগ্র স্থানটি কীৰ্ত্তনোৎসবে মুখরিত হইয়াছিল। পাহাড়ের উপরে মহেন্দ্রনাথ ঘোষালের বেড়াশূন্য চৌচালা টিনের ঘরটিকে পূজনীয় বিধুভূষণ বসু মেরামত করাইয়া চতুৰ্দ্দিকে বেড়া দেওয়াইলেন, একখানি রান্নাঘর তৈয়ার করাইলেন। একটি নলকূপ খনন করাইলেন । চারিদিক পরিষ্কার করাইয়া পাহাড়ের উপর উঠিবার সরু রাস্তাটিরও সংস্কার করাইলেন। হাতে সময় অতি সংক্ষিপ্ত, ১০ই শ্রাবণ আশ্রম প্রতিষ্ঠা, সুতরাং মন্দির বা অন্য কোন ঘর তৈয়ার করা সম্ভব নয়। একমাত্র বিধুদার আপ্রাণ চেষ্টায় ঐভাবে ১০ই শ্রাবণ আশ্রম প্রতিষ্ঠা সম্ভব হইয়াছিল। তিনি আজ পরলোকে কিন্তু আশ্রম প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁহার অদম্য উৎসাহ ও প্রচেষ্টা চিরস্মরণীয়।
কৈবল্যধামে ১৫ই ফাল্গুনের ২/৩ দিন পূৰ্ব্ব হইতেই লোক সমাগম আরম্ভ হইয়াছিল। ঠাকুর নোয়াখালি হইতে রওনা হইলেন। আর আমরা চট্টগ্রাম মেলে চাঁদপুর হইতে চট্টগ্রাম অভিমুখে রওনা হইলাম। একটি লম্বা তৃতীয় শ্রেণীর কামরায় উঠিয়াছি, বিশেষ ভিড় নাই । লাকসাম ষ্টেশনে গাড়ী পৌছিলে চাঁদপুর, কুমিল্লা, নোয়াখালি ও চৌমুহনীর সব ভক্তই ঠাকুরকে ঘিরিয়া এক গাড়ীতে উঠিলেন। ফেণী ষ্টেশনেও অনেক ভক্ত ঐ কামরায় উঠিয়াছিলেন। ট্রেনখানি পরদিন বেলা প্রায় নয়টার সময় কৈবল্যধামের নিকটে আসিলে দেখিলাম রেল লাইনের ধারে কৈবল্যকুণ্ডের পশ্চিম পাড়ে খোল-করতাল সহযোগে মধুর কীর্ত্তন চলিতেছে। ট্রেন ধীরে ধীরে চলিতেছে। দূর হইতে শ্রীশ্রীঠাকুরের প্রতি অঙ্গুলী নির্দ্দেশ করিতেই সবাই পরম আনন্দে নৃত্য করিয়া উদ্দাম কীৰ্ত্তনে মত্ত হইয়াছিলেন! কৈবল্যধাম দেখিয়াই ঠাকুর যেন ভাবাবিষ্ট হইয়া পড়িলেন। ঠাকুরকে ধরিয়া বসিয়াছিলাম, জীবনে আর কোন দিন ঠাকুরের এমন অবস্থা দেখি নাই । পাহাড়তলী ষ্টেশনে ট্রেনটি পৌছিলে গুরুভ্রাতারা প্রায় সকলেই নামিয়া কৈবল্যধাম চলিয়া গেলেন। আমি ঠাকুরকে লইয়া চট্টগ্রাম পৌছিলে বিধুদা মোটরে করিয়া আমাদের তাঁহার বাসায় লইয়া গেলেন। ১৫ই ফাল্গুন বিধুদারও নিজস্ব গৃহপ্রবেশের দিন ছিল। ঐদিন প্রথমে ঠাকুরকে লইয়া বিধুদা আপন গৃহ-প্রবেশ করিলেন। পরে প্রায় বেলা নয়টার সময় বিধুদার নিয়োজিত একখানি বড় মোটর গাড়ী করিয়া ঠাকুর বিধুদা ও অন্যান্য ভক্তকে সঙ্গে লইয়া কৈবল্যধামের পাদদেশে আসিলেন। উদ্দাম কীৰ্ত্তন, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনি সহযোগে উপস্থিতি সবাই ঠাকুরকে অভ্যর্থনা করিলেন। পাহাড়ের উপর উঠিবার সময় ঠাকুরের শ্রীদেহে ফুল ও নানা গন্ধদ্রব্য ছড়ান হইয়াছিল। বিমল আনন্দের স্রোত বহিতেছিল। নানা স্থান হইতে বহু আশ্রিত ভক্ত আসিয়াছেন। স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় অস্থায়িভাবে টিনের আচ্ছাদন তৈয়ারি হইয়াছিল। তখনও হিমের আমেজ ছিল। ঐ আচ্ছাদনের মধ্যে খড় বিছাইয়া সকলে বিছানা করিয়া রাত্রিতে শয়ন করিতাম। আশ্রিতদের মধ্যে ভেদাভেদের চিহ্নমাত্র ছিল না, সবাই যেন একই পরিবারের লোক আর তাহাদের একমাত্র কর্তা শ্রীশ্রীঠাকুর । ঠাকুরের চিন্তাই সকলের মনকে আচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছিল। তিন দিন ধরিয়া চলিল মহোৎসব। প্রসাদ বিতরণের সময় দেখিলাম অসংখ্য লোক উপস্থিত। তখন কৈবল্যধামের স্থান খুব সঙ্কীর্ণ ছিল। প্রসাদ পাইবার জন্য লোকের এত আগ্রহ আর কোন দিন দেখি নাই। একবার কলার পাতা পাতিয়া আর উঠাইতে হইল না। একই পাতাতে প্রত্যহ রাত্রি বারোটা পর্য্যন্ত সবাই প্রসাদ গ্রহণ করিয়াছিলেন। জীবনে অনেক মহোৎসবে যোগদান করিয়াছি, কিন্তু আর কোন দিন ঐভাবে একই পাতায় বারবার প্রসাদ পাইতে দেখি নাই । সমস্ত দিন ধরিয়া প্রসাদ বিতরণ করা হইয়াছিল। কিন্তু কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্য কোথাও কোন অসুবিধা ঘটিতে পারে নাই ।
মনে পড়ে, রাত্রিতে আমরা কয়েকজন একেবারেই শয়ন করি নাই । সারা বাত্রি ধরিয়া আশ্রমবাসীদের নিরাপত্তার জন্য পাহারায় ব্যাপৃত ছিলাম। তিন দিন ধরিয়া একই ভাবে মহোৎসব চলিয়াছিল। একটানা পরিশ্রমে আমি জ্বরে পড়িলাম । এক সময় দেখিলাম, ঠাকুর আমার শিয়রে আসিয়া বসিলেন । শ্রীশ্রীঠাকুর মাত্র তিন দিন তিন রাত্রি স্থূলভাবে কৈবল্যধামে বাস করিয়াছিলেন । পরদিন সকালে চট্টগ্রামে বিধুদার বাসায় চলিয়া যান ।
চাঁদপুরে ফিরিয়া আসিবার কয়েক দিন পরে শুনিলাম ঠাকুর বলিয়াছেন, আর কোনদিন স্থূল শরীরে কৈবল্যধামে যাইবেন না। এই সংবাদে খুবই দুঃখিত হইলাম। গুরুভ্রাতাদের একান্ত ইচ্ছা, ঠাকুর নানাস্থানে না ঘুরিয়া কৈবল্যধামে বাস করিবেন এবং সবাই সময়মত তাঁহার শ্রীচরণ দর্শন করিতে পারিবেন। এই আশা করিয়াই তাঁহারা সম্মিলিত চেষ্টায় এই কৈবল্যধামের নির্ম্মাণকার্য্য সমাধা করিয়াছেন। ১৫/২০ দিন পরে ঠাকুর চাঁদপুরে আসিলে আমি জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, “আপনি নাকি আর কৈবল্যধামে যাইবেন না?” ঠাকুর বলিলেন, যেমন বাড়ী বাড়ী ঘুরিয়া বেড়ান এখনও সেইরূপ ঘুরিয়া বেড়াইবেন। আর কোন দিন শ্রীশ্রীঠাকুর ঐ কৈবল্যধামে স্থূল শরীরে প্রবেশ করেন নাই ।
শ্রীগুরু শ্রীশ্রীরাম ঠাকুর
রোহিণী কুমার মজুমদার
