কে আপন? ঘুমের মধ্যে থাকিতে যিনি থাকেন তিনিই আপন, যাঁহারা থাকেন না,তাহারা পর জানিবেন।
শ্রীশ্রীরাম ঠাকুরের এই অমর বাণীটি অত্যন্ত গভীর এবং পারমার্থিক সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
আমরা জাগতিক জীবনে যাদের 'আপন' বলে মনে করি—যেমন আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব বা বিষয়-সম্পত্তি—গভীর ঘুমের ঘোরে আমরা তাদের কাউকেই মনে রাখতে পারি না। এমনকি নিজের দেহ বা আমিত্বের বোধও তখন থাকে না। কিন্তু সেই সুপ্তাবস্থাতেও এমন একজন 'সত্তা' আমাদের সাথে থাকেন, যার অস্তিত্বের কারণে আমরা ঘুম থেকে উঠে বলতে পারি, "আমি শান্তিতে ঘুমিয়েছিলাম।" সেই নিত্যসঙ্গী পরমাত্মা বা ভগবানই প্রকৃত আপন।
জাগতিক সম্পর্কের সীমাবদ্ধতা: আমরা সাধারণত রক্ত বা স্নেহের সম্পর্কের মানুষদের আপন ভাবি। কিন্তু এই আপনত্বের বোধ কেবল আমাদের জাগ্রত বা সচেতন অবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ঘুমের মধ্যে যখন আমাদের বাইরের জ্ঞান লোপ পায়, তখন আমাদের সবচেয়ে প্রিয়জনরাও আমাদের চেতনার বাইরে চলে যান। তাই ঠাকুর তাদের 'পর' বা অস্থায়ী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
ঘুমের মধ্যে যিনি থাকেন: ঘুমের গভীর স্তরে (সুশুক্তি অবস্থা) মানুষের মন, বুদ্ধি এবং অহংকার লীন হয়ে যায়। কিন্তু তখনও প্রাণের স্পন্দন এবং অস্তিত্বের ধারা বজায় থাকে। এই সময় যিনি আমাদের আগলে রাখেন এবং যার উপস্থিতিতে আমরা বিশ্রাম পাই, তিনিই আমাদের আত্মার পরমাত্মীয়।
সত্যিকারের আপন কে: শ্রীশ্রীরাম ঠাকুরের দর্শনে, ঈশ্বর বা গুরুই একমাত্র চিরসাথী। জীবনের ঝড়-ঝাপটা, জন্ম-মৃত্যু এমনকি গভীর নিদ্রার অন্ধকার—সব অবস্থাতেই তিনি আমাদের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত থাকেন। বাকি সবকিছুই সময়ের নিয়মে আসে এবং চলে যায়।
জীবনের শিক্ষা
এই বাণীর মাধ্যমে ঠাকুর আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, বাইরের জগতের মেলামেশা বা সম্পর্ক পালন করার পাশাপাশি নিজের অন্তরের সেই চিরস্থায়ী সঙ্গীর (ভগবানের) খোঁজ করা উচিত। কারণ জগতসংসারের সবাই প্রতিকূল সময়ে বা চেতনার অভাবে পর হয়ে যেতে পারে, কিন্তু তিনি কখনও আমাদের ত্যাগ করেন না।
তাই প্রকৃত শান্তি পেতে হলে সেই 'অখণ্ড' পরমাত্মার চরণে নিজেকে সমর্পণ করাই হলো বুদ্ধিমানের কাজ।
